অনলাইন ডেস্ক:
গ্রাম বন্দরের প্রস্তাবিত নতুন মাশুল গত ২৪ জুলাই অনুমোদন দিয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। এরপর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে ওই প্রস্তাব গেজেট আকারে প্রকাশ হলে নতুন মাশুল কার্যকর হওয়ার কথা। কিন্তু তার আগেই একসঙ্গে গড়ে ৪১ শতাংশ হারে মাশুল বাড়ানোর বিষয়ে আপত্তি জানায় ব্যবহারকারীরা। এই অবস্থায় গেজেট প্রকাশের আগে শেষ মুহূর্তে বন্দরের মাশুল বাড়ানোর বিষয়টি আবারও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত নতুন মাশুল পর্যালোচনার জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষ ও ব্যবহারকারীদের নিয়ে আজ সোমবার বিকেলে সভা ডেকেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। এতে সভাপতিত্ব করবেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন। বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন বন্দরসচিব মো. ওমর ফারুক। এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রস্তাবিত ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত মাশুলের হার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নতুন মাশুল কার্যকর হলে বন্দরের আয় বাড়বে গড়ে ৪১ শতাংশ। প্রতিবছর ডলারের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই আয়ও বাড়বে। কারণ, বন্দরের সব মাশুল ডলারে নির্ধারণ করা হয়। ■ বর্তমানে বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতিটি কনটেইনার (২০ ফুট লম্বা) থেকে গড়ে মাশুল আদায় করে ১১ হাজার ৮৪৯ টাকা। ■ নতুন মাশুল কার্যকর হলে কনটেইনারপ্রতি বাড়তি দিতে হবে গড়ে ৪ হাজার ৩৯৫ টাকা। ■ আমদানি কনটেইনারে মাশুল বাড়বে ৫ হাজার ৭২০ টাকা। ■ রপ্তানি কনটেইনারে মাশুল বাড়বে ৩ হাজার ৪৫ টাকা। প্রস্তাবিত মাশুল অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি বাড়ানো হয়েছে কনটেইনার পরিবহনের মাশুল। কনটেইনারে পণ্য আনা–নেওয়ার জন্য বন্দর সুবিধা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়। বর্ধিত মাশুল কার্যকর হলে কনটেইনারপ্রতি (২০ ফুট লম্বা) বাড়তি মাশুল দিতে হবে ৪ হাজার ৩৯৫ টাকা। সাধারণ পণ্য খালাসে বন্দর–সেবার খুব সামান্য ব্যবহার হয়। ফলে সাধারণ পণ্যে মাশুল বাড়লেও কনটেইনারের তুলনায় তা কম। কনটেইনারসহ মোট পণ্যের হিসাবে, গড়ে প্রতি কেজিতে মাশুল বাড়বে ১৪ পয়সা। মাশুল বাড়ানোর বিষয়ে ব্যবহারকারীদের আপত্তির জায়গা হলো, একলাফে গড়ে ৪১ শতাংশ হারে মাশুল বাড়ানো হলে ভোক্তার ওপর চাপ পড়বে। রপ্তানি খাতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমবে। ভবিষ্যতে বন্দরের দুটি টার্মিনাল ছাড়া সব কটিই যাচ্ছে বিদেশিদের হাতে। ফলে মাশুল বাড়ানো হলেও তার বড় সুফল পাবে বিদেশি অপারেটররা। অন্যদিকে সরকারের ভাষ্য হলো, ১৯৮৬ সালের পর বন্দরের মাশুল বাড়ানো হচ্ছে। মাশুল বাড়ানোর পরও তা আশপাশের দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম থাকবে।
রপ্তানি খাতে কনটেইনারে পণ্য আমদানি বাবদ একবার মাশুল দিতে হয়। আবার রপ্তানির সময় আরেক দফা মাশুল দিতে হয়। সেই হিসাবে কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্যে দুই দফায় বাড়তি মাশুল দিতে হবে, যা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়
—এস এম আবু তৈয়ব, পরিচালক, বিজিএমইএ
জানতে চাইলে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম চট্টগ্রামের সভাপতি ও বিজিএমইএ পরিচালক এস এম আবু তৈয়ব প্রথম আলোকে বলেন, এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রের ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক নিয়ে চাপে আছেন রপ্তানিকারকেরা। এখন নতুন করে বন্দরের মাশুল ৪১ শতাংশ বাড়ানো হলে রপ্তানিকারকদের সক্ষমতা ও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ কমবে। তিনি বলেন, রপ্তানি খাতে কনটেইনারে পণ্য আমদানি বাবদ একবার মাশুল দিতে হয়। আবার রপ্তানির সময় আরেক দফা মাশুল দিতে হয়। সেই হিসাবে কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্যে দুই দফায় বাড়তি মাশুল দিতে হবে, যা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়। নতুন ও প্রস্তাবিত মাশুল তুলনা করে দেখা যায়, বর্তমানে বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতিটি কনটেইনার (২০ ফুট লম্বা) থেকে গড়ে মাশুল আদায় করে ১১ হাজার ৮৪৯ টাকা। নতুন মাশুল কার্যকর হলে কনটেইনারপ্রতি বাড়তি দিতে হবে গড়ে ৪ হাজার ৩৯৫ টাকা। তখন সব মিলিয়ে কনটেইনারপ্রতি গড়ে মাশুল দিতে হবে ১৬ হাজার ২৪৩ টাকা। সেই হিসাবে প্রতি কনটেইনারে মাশুল বাড়ছে গড়ে ৩৭ শতাংশ। বন্দরের গত ২০২৩–২৪ অর্থবছরের নিরীক্ষিত হিসাব ধরে নতুন মাশুল কনটেইনারপ্রতি কত বাড়বে তার হিসাব বের করেছে এই প্রতিবেদক। প্রস্তাবিত নতুন মাশুলের ক্ষেত্রে ডলারপ্রতি বিনিময় মূল্য ধরা হয়েছে ১২২ টাকা। ডলারের বিনিময় মূল্য বাড়লে মাশুলও বাড়বে। কারণ, বন্দর কর্তৃপক্ষ ডলার হিসেবে মাশুল আদায় করে। কনটেইনার ছাড়াও কনটেইনার জাহাজের সেবা নেওয়ার জন্য আলাদা মাশুল দিতে হয়। আবার কনটেইনারভেদে খরচ আবার কমবেশি হবে। যেমন আমদানি কনটেইনার হলে মাশুল বাড়বে ৫ হাজার ৭২০ টাকা। রপ্তানি কনটেইনার হলে মাশুল বাড়বে ৩ হাজার ৪৫ টাকা। কনটেইনারে মাশুল বাড়ার বড় খাত হলো জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো ও নামানো। প্রতি একক কনটেইনার ওঠানো বা নামানোর জন্য আগে মাশুল ছিল ৪৩ দশমিক ৪০ ডলার। এখন তা বাড়িয়ে ৬৮ ডলার করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ এই একটি মাশুল বেড়েছে ২৪ দশশিক ৬০ ডলার বা প্রায় তিন হাজার টাকা। এ ছাড়া রিভার ডিউজ, কনটেইনার সংরক্ষণ, চত্বরে কনটেইনার ওঠানো–নামানো ও গ্যান্ট্রি ক্রেন ব্যবহারসহ নানা মাশুল রয়েছে। কনটেইনার পণ্যে প্রতি কেজিতে গড়ে বর্তমানে মাশুল দিতে হয় ১ টাকা ২৮ পয়সা। প্রস্তাবিত মাশুল কার্যকর হলে প্রতি কেজি কনটেইনার পণ্যে বাড়তি দিতে হবে ৪৭ পয়সা। সমুদ্রপথে বাংলাদেশের রপ্তানির প্রায় পুরোটাই হয় কনটেইনারে। আবার কনটেইনারে করে শিল্পের কাঁচামাল ও মূল্যবান যন্ত্রপাতিও আমদানি হয়। সমুদ্রপথে আমদানি–রপ্তানি কনটেইনারের ৯৯ শতাংশই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পরিবহন হয়। ফলে কনটেইনারে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে মাশুল বাড়ানোর প্রভাব বেশি পড়বে বলে জানান ব্যবহারকারীরা। বন্দর দিয়ে কনটেইনার ছাড়াও সাধারণ পণ্য পরিবহন হয়। বন্দরের হিসাবে, প্রস্তাবিত বর্ধিত মাশুল কার্যকর হলে সব ধরনের পণ্যে কেজিপ্রতি মাশুল বাড়বে গড়ে ১৪ পয়সা। বর্তমানে কেজিপ্রতি ৩৫ পয়সা মাশুল দিতে হয়। সেই হিসাবে গড় হিসেবে মাশুল বাড়ছে ৪১ শতাংশ। কনটেইনারের মতো সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজগুলো বন্দর সুবিধার খুব সামান্যই ব্যবহার করে। যেমন বাল্ক জাহাজের বেশির ভাগই সাগরে নোঙর করে ছোট জাহাজে পণ্য স্থানান্তর করে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বন্দর দিয়ে মোট পণ্যের ৫৯ শতাংশই খালাস হয়েছে বহির্নোঙরে।
সম্পাদক : হালিমা খাতুন, নির্বাহী সম্পাদক : মুন্সি মোঃ আল ইমরান। MAA 23 Multimedia Limited এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৭৮/৪/ সি তৃতীয় তলা, কাজলা ব্রীজ-উত্তর যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। ফোন ০২-২২৩৩৪২১৪১, মুঠোফোন : ০১৮১৭-৫৩০৯৫২, ০১৯৭৯-৭৯৯১৪৬। ইমেইল : dailybartomandeshsangbad@gmail.com
© All rights reserved © Maa 23 Multimedia Limited